ঢাকা, বুধবার, ৬ই জুলাই, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ২২শে আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৭ই জিলহজ, ১৪৪৩ হিজরি, রাত ৪:৩২
বাংলা বাংলা English English

বুধবার, ৬ই জুলাই, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ২২শে আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

করোনা জয়ী মাঙ্গলিক নৈবেদ্য


অমিত প্রাণস্পন্দনে পরিপূর্ণ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নববর্ষ অবগাহনে জনপ্রিয়তায় অতুলনীয় সংগীতের পঙ্ক্তি উচ্চারণে নিবন্ধের সূচনাপাঠ-‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো/তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,/বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক/যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি, অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক/মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।/রসের আবেশরাশি শুষ্ক করি দাও আসি,/আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ।/মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক।’

দেশীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে করোনা অতিমারির প্রবল সংক্রমণ ও বিপুল প্রাণসংহারের দুঃসহ যন্ত্রণা-আতঙ্ক অতিক্রান্তে সমকালীন সময়ে বিজয়ী পৃথিবী নামক এ ধরিত্রী। বাংলা নববর্ষ ১৪২৯ আপামর বাঙালির অসহায় হৃদয়ে নবতর মানবিক প্রচেতার উন্মেষ ঘটিয়ে আলোর সন্ধানে অগ্রগণ্য করার ব্রতে ঋদ্ধ। বাঙালি বরাবরই দৃঢ়চেতা ও আত্মপ্রত্যয়ী এবং বীরত্বের গৌরবগাথায় অভিষিক্ত। দুর্ভেদ্য ভয়কে জয় করে বিজয় পতাকা উড্ডীন করার মধ্যে বাঙালি জাতির কৃষ্টি-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের বিকাশমানতা প্রমুদিত।

স্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে জনসমাগম ব্যাপৃত অতি আড়ম্বর পরিবেশে নববর্ষ উদযাপন কিছুটা সীমিত পরিসরে হলেও; প্রত্যেক বাঙালি পরিবার-বাঙালি হৃদয় নববর্ষকে সাবলীল ও স্বাভাবিকতায় বাঁধভাঙা আনন্দে মেতে উঠার লক্ষ্যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ষড়ঋতুর মহাজাগতিক অপরূপ বিদায়-বরণে পরিশুদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতির সঞ্চারিত আবেগ-আনন্দ-নান্দনিক-মাঙ্গলিক মূল্যবোধকে অত্যুজ্জ্বল রাখার ক্ষেত্রে জাতি কখনো কোনো সংকটকে অন্তরায় মনে করে না। বৈশাখের প্রথম প্রহরে রবিঠাকুরের উল্লেখিত গান উপস্থাপনে সব অন্ধকারকে দূরীভূত করে জগৎকে আলোয় উদ্ভাসিত করার নিগূঢ় শপথ গ্রহণ করবে, নিঃসন্দেহে তা বলা যায়।

এটি সর্বজনবিদিত যে, বিশ্বের প্রায় সব জাতিগোষ্ঠীর নববর্ষ উদযাপনের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও রীতিনীতি দীর্ঘ প্রাচীন ইতিহাসসমৃদ্ধ। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বিপুলসংখ্যক দেশে জাতিগোষ্ঠী, উপজাতি বা আদিবাসী প্রত্যেকেই প্রায় নিজস্ব পঞ্জিকা বা নির্ধারিত তারিখ অনুসারে নববর্ষ উদযাপনের মাধ্যমে বংশ পরম্পরায় জাতিগত স্বজাত্য কৃষ্টির অনুশীলনকে ধারণ করে আসছে।

মূলত এরই পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন মাত্রিকতায় বিশ্বজনীন আধুনিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। বেশ কিছু জাতিগোষ্ঠীর মতো বাংলা নববর্ষের প্রচলন ও উদযাপন ভারতবর্ষের কৃষি কাঠামোর পরিবর্তন বাস্তবতায় নিরূপিত। এদেশে দীর্ঘকাল ধরে অপরিণাম-সংকীর্ণ একদেশদর্শী এবং ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িকগোষ্ঠী অনর্থক বাংলা নববর্ষ উদযাপনকে বিরূপ বৈশিষ্ট্যে বিরাগী করার অপচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বা অন্যান্য জাতি যেমন-ইংরেজ, তাইওয়ান, স্কটিস এবং ইউরোপীয় অনেক ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী নানা অভিধায় ভাবার্থ আবেগে নববর্ষ উদযাপনে প্রকীর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে ব্যাবিলন সভ্যতায় এবং ইরান, চীন, ভিয়েতনাম, লাওসসহ অন্যান্য দেশে নববর্ষ উদযাপনের পরিপ্রেক্ষিত জগজ্জয়ী। উল্লেখ্য, লাওসের নববর্ষ উৎসব যে দিন থেকে শুরু হয়, কাকতালীয়ভাবে সেদিনই বাংলাদেশের পহেলা বৈশাখ।

খ্যাতিমান কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতানুসারে, আসমুদ্রহিমাচল আমাদের এ দেশের নাম বঙ্গদেশ বা বাংলাদেশ। বঙ্গ শব্দের সঙ্গে আল যুক্ত হয়ে দেশের নাম বাঙ্গাল বা বাঙ্গালা হয়েছে। আল বলতে শুধু খেতের আল নয়, ছোটো বড়ো বাঁধও বোঝায়। বাংলাদেশ পানি বৃষ্টির দেশ। ছোটো বড়ো বাঁধ না দিলে বৃষ্টি, বন্যা আর জোয়ারের হাত থেকে ভিটে-মাটি-খেত-খামার রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। যে অঞ্চলে পানি কম হয়, সে অঞ্চলেও বর্ষার পানি ধারণ করার জন্য বাঁধের প্রয়োজন।

প্রায়োগিক পানি-ব্যবস্থাপনার কারণেই ‘আল’ এর সংখ্যাভিত্তিক অধিকতর প্রতুলতায় জমির বিভাজন প্রক্রিয়ায় এদেশের নামকরণ হয়েছে বাঙ্গালা বা বাংলাদেশ। সচেতন সব মহলের সম্যক জানা যে, বিপ্রতীপ অনুধ্যানে বদ্বীপ খ্যাত ক্ষুদ্র আয়তনের স্বাধীন বাংলাদেশ শুধু ভারতবর্ষ নয়, বিশ্ব ইতিহাসের ঐতিহ্যিক মূল্যায়নে বর্ণিল ও সুপ্রাচীন সমাজ ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হিসাবে বিবেচিত।

রাঢ়-মৌর্য-তুর্কি-পাঠান-মোগল-ইংরেজ পাকিস্তানসহ নানা ভিনদেশি ঔপনিবেশিক শাসনকালে বাংলার সমাজ ইতিহাস মানব-গোষ্ঠীর কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ভাষা, সাহিত্য, ধর্ম, চিন্তা-চেতনা ইত্যাদির অবর্ণনীয় ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বর্তমান অবস্থানে উপনীত হয়েছে। গাঙ্গেয় নদী বিধৌত প্রাকৃতিক সবুজ আচ্ছাদিত এ অঞ্চলে আর্যদের আগমনের প্রায় ১৫০০ বছর আগে বাঙালির জীবনযাত্রার স্বগত উন্মীলন।

কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতির পাঠোদ্ধারে বাঙালি জাতির অবদান বিবেচনা সর্বজনস্বীকৃত। দ্রাবিড় সভ্যতার ক্রমবিস্তারের আড়ালে বাঙালি জনগোষ্ঠী আর্য ও অনার্যদের সংঘাত রসায়নে অভিমিশ্র ভাষা-ঐতিহ্য-কৃষ্টির বহমানতায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠে। এর ফলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ব্যতিক্রম প্রত্যয় সৃজন করে স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম ব্যবস্থাকে বিশ্বপরিমণ্ডলে সুপরিচিত করে তুলে। অধ্যাপক আলী নেওয়াজের মতে, ‘তথাকথিত সভ্য আর্যরা এদেশে এসে অনার্যদের সংস্কৃতির বারো আনাই মেনে নিয়েছিল, নবান্ন উৎসবটিও তারা বাদ দেয়নি, যার রেওয়াজ আজও বাংলাদেশে চলছে।’

স্মরণাতীত কাল থেকে ধন-ধান্যে ভরা অগ্রহায়ণ মাসের নবান্ন উৎসবকে উপলক্ষ্য করে বাঙালির বছর গণনা পরবর্তীতে মুসলিম আমলেও যে প্রচলিত ছিল, বহু সূত্র থেকে তার সত্যতা সমর্থনপুষ্ট। প্রায় ৫০০ বছর আগে কবি মুকুন্দরাম তার চণ্ডিমঙ্গল কাব্যে ‘ধন্য অগ্রহায়ণ মাস-ধন্য অগ্রহায়ণ মাস, বিফল জনম তার নাহি যার চাষ’ পঙ্ক্তির মাধ্যমে সে যুগের কৃষিজীবী বাঙালির সাল গণনার যথার্থতা সত্যাগ্রহী করেছেন।

ঐতিহাসিক বহু তথ্য থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, বাংলাদেশে আর্য হিন্দুদের শত বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রচলিত অনার্যদের প্রচীন আমলের কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতি-বধূবরণ, অন্ন প্রাশন, সংক্রান্তি, গৃহ প্রবেশ, জমি কর্ষণ, ফসল তোলা, আচার-অনুষ্ঠান, রীতি ও প্রথার বিলুপ্তি ঘটেনি; বরং বৌদ্ধ, হিন্দু এবং সূফী মনীষীদের মাধ্যমে ইসলাম ধর্ম প্রচারের পরও এ ধরনের কৃষি সংস্কৃতির উপাদানগুলো বাঙালি ঐতিহ্যের নিয়ামক হিসাবে প্রধান আচার-অনুষ্ঠান ও মঙ্গল-আনন্দের কর্মকাণ্ডের অস্তিত্বকে সমুজ্জ্বল করেছে।

এসব আচার-অনুষ্ঠানকে ‘হিন্দুয়ানী’ বলে আখ্যায়িত করার অবিরাম অপচেষ্টা এ দেশের কিছু সংখ্যক কুশিক্ষিত ধর্ম-ব্যবসায়ী ও সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতিবিরোধী ব্যক্তিবর্গের নষ্ট-ভ্রষ্ট মানসিকতার যে পরিচায়ক, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। চমকপ্রদ ও সমাদৃত অনন্য সংযোজন হচ্ছে, নববর্ষের বাংলা সালের ‘সন’ শব্দটি আরবি, পহেলা বৈশাখের ‘পহেলা’ শব্দটি ফারসি এবং বছরের প্রারম্ভে ব্যবসা বাণিজ্যে প্রচলিত ‘হালখাতা’ শব্দটি ইসলামি।

মুঘল সম্রাট আকবর ৯৬৩ হিজরি (চান্দ্র বর্ষ) ২ রবি উসসানি, রোজ শুক্রবার, ইংরেজি ১৪ এপ্রিল ১৫৫৬ সাল থেকে পহেলা বৈশাখ পালনের রেওয়াজ শুরু করেন। সৌর বৎসর (বঙ্গাব্দ) ও চান্দ্রবর্ষ (হিজরি) উভয়ের অপূর্ব সন্ধিক্ষণে রাজজ্যোতিষী আমীর ফতেউল্লাহ সিরাজীর সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে শুভক্ষণ গণনার দিন হিসাবে পহেলা বৈশাখকে নববর্ষ উদযাপনের দিন হিসাবে ধার্য করা হয়। বর্ষ গণনায় প্রতিটি মাসের ৩০ বা ৩১ দিনের নামও ছিল ভিন্ন ভিন্ন প্রক্রিয়ায় শোভিত।

প্রণিধানযোগ্য, সম্রাট আকবরের পৌত্র সম্রাট শাহজাহানই বিভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্রের নামানুসারে পুরো মাসকে সপ্তাহে বিভক্ত করে দিনগুলোর নাম নির্ধারণ করে পাশ্চাত্য সময়-সাল গণনার সঙ্গে অভিন্নতা নির্দিষ্টকরণে রোববারকে সপ্তাহের প্রথম দিন হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। বিভিন্ন দেবতা-গ্রহের নামানুসারে দিনপঞ্জির পর্যায়ক্রম ছিল অপূর্ব।

সূর্য দেবতার নামে রোববার, শিব দেবতার নামে সোমবার, মঙ্গল গ্রহের নামে মঙ্গলবার, বুধ গ্রহের নামে বুধবার, বৃহস্পতি গ্রহের নামে বৃহস্পতিবার, শুক্র গ্রহের নামে শুক্রবার এবং শনি গ্রহের নামে শনিবার রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয়েছিল হিজরি সালকে উপেক্ষা করে নয়; বরং হিজরি ৯৬৩ সালকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে শুধু ফসল তোলার সময়কে সৌরবর্ষের সঙ্গে সামঞ্জস্য করার উদ্দেশ্যে সূর্যকে মানদণ্ড ধরে সৌরবর্ষ অথবা ফসলি বর্ষ হিসাবে এটিকে অর্থিত করা হয়েছে। কিন্তু এ সৌরবর্ষ ও চান্দ্র বৎসরের ব্যবধানকে যথাযথভাবে সংযোজিত করে নতুন বঙ্গাব্দের পরিচয় বহনে এ দিনের সূচনা এবং এটি চান্দ্র ও সৌর বৎসরের নিবিড়তম সংযোগ।

নক্ষত্র মণ্ডলে চন্দ্রের আবর্তনে বিশেষ তারাগুলোর অবস্থানের ওপর ভিত্তি করেই বঙ্গাব্দের বারো মাসের নামকরণ করা হয়েছে। সূর্যসিদ্ধান্ত নামে জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক প্রাচীন গ্রন্থ থেকে নেওয়া নক্ষত্র তথা বিশাখা, জ্যেষ্ঠা, উত্তরাষাঢ়া, শ্রবণা, পূর্বভাদ্রপদ, অশ্বিনী, কৃত্তিকা, মৃগশিরা, পুষ্যা, মঘা, উত্তরফাল্গুনী, চিত্রা ইত্যাদির নামানুসারে বাংলা মাসের নাম যথাক্রমে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ (মাঘশীর্ষ), পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্রের নামকরণ হয়েছে।

এতে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, বাঙালির নববর্ষের প্রচলন ও বরণ করার যে শ্বাশত অনুষ্ঠান, তা সবকিছুই মুসলমান শাসকদের সৃষ্ট এবং চিরায়ত বাংলা সংস্কৃতিরই আবর্তিত সামাজিকীকরণ। এটি শুধু বাঙালির জাতীয় কৃষ্টিকে সমৃদ্ধ করে না, দক্ষিণ ভারতসহ পুরো বাঙালি জাতিসত্ত্বা নিরূপণে চন্দ্রাতপ আচ্ছাদনে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।

সঠিক ইতিহাস চর্চা ও পরিচর্যায় এটি সুপ্রতিষ্ঠিত যে, বাংলা নববর্ষ উদযাপন কোনো বিশেষ ধর্ম বা সম্প্রদায়ের উৎসব নয়। এটি ধর্ম-বর্ণ-দলমত-অঞ্চল নির্বিশেষে বাঙালির সহজাত ও চিরন্তন দৃষ্টিভঙ্গি সমধিক প্রকাশিত এবং সমাদৃত। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে অন্ধকারের অশুভ শক্তির কোনো ধরনের কূট প্ররোচণা-প্রচারণা ও দুরভিসন্ধির অপকৌশল-উদ্যোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রণত অনুষঙ্গে জাতীয় কবি নজরুলের ‘পল্লী-জননী’ কবিতার চরণ নিবেদনে প্রতিটি ঋতুর প্রকৃতি ও চরিত্র অনুধাবনের তাৎপর্য বাঙালির হৃদয় গভীরে প্রোথিত করতে হবে-‘একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী-জননী।/ ফুলে ও ফসলে কাদা মাটি জলে ঝলমল করে লাবনী/রৌদ্রতপ্ত বৈশাখে তুমি চাতকের সঙ্গে চাহ জল,/আম কাঁঠালের মধুর গন্ধে জ্যৈষ্ঠে মাতাও তরুতল।/ঝঞ্ঝার সঙ্গে প্রান্তরে মাঠে কভু খেল ল’য়ে অশনি/কেতকী-কদম-যূথিকা কুসুমে বর্ষায় গাঁথ মালিকা,/পথে অবিরল ছিটাইয়া জল খেল চঞ্চলা বালিকা।/তড়াগে পুকুরে থই থই করে শ্যামল শোভার নবনী/শাপলা শালুকে সাজাইয়া সাজি শরতে শিশিরে নাহিয়া।/অঘ্রাণে মা গো আমন ধানের সুঘ্রাণে ভরে অবনী/শীতের শূন্য মাঠে তুমি ফের উদাসী বাউল সাথে মা,/ ভাটিয়ালি গাও মাঝিদের সাথে (গো), কীর্তন শোনো রাতে মা,/ফাল্গুনে রাঙা ফুলের আবীরে রাঙাও নিখিল ধরণী।’ কী অসাধারণ উপমায় কবি নজরুল প্রতিটি ঋতুকে মহিমান্বিত করেছেন; দেশবাসী, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের উপলব্ধিতে যথার্থ অর্থে তা জ্ঞাপিত করা না হলে বাঙালির সমাজ-ইতিহাস রুদ্ধ হওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।

নববর্ষের সার্থকতা নির্ধারণে বার বার রবিঠাকুর-নজরুলের মতো বাংলার ঐতিহ্য আবিষ্কারে নিবেদিত স্বনামধন্য কবি-সাহিত্যিকদের রচনাকে নিগূঢ় স্মরণযোগ্য করতেই হবে। করোনা অতিমারির আশঙ্কা-আতঙ্ক জয় করে বাঙালির বিজয় গাথার স্বরূপ প্রতিষ্ঠায় বাংলা নববর্ষ বাঙালির অন্তর-নিকেতন অধিকতর বিকশিত করার নিষিক্ত আবেদনে পরিদৃষ্ট হোক-এই প্রত্যাশাই ব্যক্ত করি। শুভ বাংলা নববর্ষ।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : শিক্ষাবিদ; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সব খবর