ঢাকা, বুধবার, ৬ই জুলাই, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ২২শে আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৭ই জিলহজ, ১৪৪৩ হিজরি, রাত ৩:৫৮
বাংলা বাংলা English English

বুধবার, ৬ই জুলাই, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ২২শে আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

দিন দিন বাড়ছেই অগ্নিদুর্ঘটনায় হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি পরিমাণ


দিন দিন বাড়ছেই অগ্নিদুর্ঘটনায় হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই অগ্নিদুর্ঘটনার ঘটনা ঘটলেও অনেক ঘটনাই আড়ালে থেকে যায়। তবে বড় ধরনের ঘটনা ঘটলে সাময়িক কিছুটা শোরগোল তৈরি হয়। প্লাস্টিক কারখানা, কেমিক্যাল গোডাউন, আবাসিক কিংবা বাণিজ্যিক ভবনে অগ্নিদুর্ঘটনায় একদিনে যেমন অধিকসংখ্যক প্রাণহানি ঘটে, আবার ক্ষতিও হয় ব্যাপক। তা সত্ত্বেও আবাসিক এলাকায় প্লাস্টিক, কেমিক্যাল গোডাউন ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে। বিগত কয়েক বছরে ওই ধরনের ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি, কমিটির প্রতিবেদন ও একগুচ্ছ সুপারিশমালা থাকলেও বাস্তবে তা আদৌ আলোর মুখ দেখেনি। ফলে আগুনে পুড়ে প্রাণহানি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি ক্রমাগত বেড়েই চলছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিগত ৫ বছরে দেশে ১ লাখ ৪ হাজার ৪৯৫টি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে। তাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার ৪৩৮ কোটি ৪১ লক্ষ ৪১ হাজার ৫৭২ টাকা। আর নিহত হয়েছে ৭৩২ জন এবং আহত হয়েছে ২ হাজার ৪৮৩ জন। ২০১৭ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত অগ্নিনির্বাপণ করতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের একজন সদস্য নিহত এবং ৭৫ জন আহত হয়েছে। অগ্নিদুর্ঘটনায় যেমন মৃত্যু বাড়ছে, তেমনি ভস্মীভূত হচ্ছে হাজার কোটি টাকার সম্পদ।
সূত্র জানায়, বিগত ২০২১ সালে দেশে ২১ হাজার ৬০১টি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে। তাতে নিহত হয়েছে ২১৯ জন এবং আহত হয়েছে ৫৭৬ জন। আর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২১৮ কোটি ৩১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। ২০২০ সালে অগ্নিদুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ৭৩টি। তাতে নিহত হয়েছে ১৫৪ জন, আহত ৩৮৬ জন। ক্ষতির পরিমাণ ২৪৩ কোটি ৬৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। ২০১৯ সালে ২৪ হাজার ৭৩৪টি অগ্নিকাণ্ডে ১৮৪ জন নিহত এবং ৫৬০ জন আহত হয়েছে। অগ্নিনির্বাপণ করতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের এক সদস্যও নিহত হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে ৩৩০ কোটি ৪১ লাখ ২৮ হাজার টাকার। ২০১৮ সালে ১৯ হাজার ৬২৪টি অগ্নিদুর্ঘটনায় ১৩০ জন নিহত এবং ৬৭৭ জন আহত হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ ৩৮৫ কোটি ৭৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। ২০১৭ সালে ১৮ হাজার ১০৫টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত হয়েছে ৪৫ জন এবং আহত হয়েছে ২৮৪ জন। ক্ষতি হয়েছে ২৫৭ কোটি ২৪ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। প্রতি বছরই অগ্নিদুর্ঘটনার পরিমাণ, হতাহত ও ক্ষতির পরিমাণ বেড়েই চলেছে। আর বাসা-বাড়ি, আবাসিক এলাকায় সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। গত বছরের এই সংখ্যা ৫ হাজার ৮১৮টি। তাতে ক্ষতি হয়েছে ৬৪ কোটি ১১ লাখ টাকার। রান্নাঘরে সংঘটিত আগুনের সংখ্যা বেশি। ওই সংখ্যা তিন হাজার ৫৪৪টি। আর ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটছে।
সূত্র আরো জানায়, বিগত কয়েক বছরে ভয়াবহ বেশ কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা সাহসিকতা ও সতর্কতার সঙ্গে মোকাবেলা করে আসছে। এখন বহুতল ভবনের আগুন নিয়ন্ত্রণেও ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা রয়েছে। বিভিন্ন সময় লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিস সদস্যদের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। ২০১৯ সালে বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিদুর্ঘটনায় সোহেল রানা নামের একজন ফায়ার ফাইটার নিহত হয়েছে। ওই ঘটনার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে সীতাকু-ে ১২ জন ফায়ার ফাইটারের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ড প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অবস্থা থেকে বের হতে নীতিনির্ধারণী ও মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, সমন্বয় ও পর্যবেক্ষণ বাড়ানো জরুরি। রাষ্ট্রের অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে এ ধরনের দুর্ঘটনা বৃদ্ধির শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। শুধু সচেতনতা, পরামর্শ ও সুপারিশমালা দিয়ে অগ্নিদুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব নয়। সেজন্য প্রয়োজন আগাম প্রস্তুতি ও দেখভালের দায়িত্বে থাকা সংস্থার সমন্বয়। রাজউক শুধু ভবন নির্মাণের অনুমতি দিয়েই দায় সারছে। পরবর্তী সময়ে কোন সংস্থাই অনুমোদন দেয়া ভবনগুলো পরিদর্শন করে না। ভবন নির্মাণের সময় সব ধরনের ইঞ্জিনিয়ারের পার্ট থাকলেও ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের কোন পার্টই রাখা হচ্ছে না। তাতে ইলেক্ট্রিক্যাল ডিজাইন ঠিক মতো হচ্ছে না এবং প্রতিনিয়ত বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের ঘটনা ঘটছে। ভাল মানের তার ব্যবহার করছে না ভবন কর্তৃপক্ষ। বরং সামান্য খরচ বাঁচাতে নিম্নমানের তার ব্যবহার করছে। ডেভেলপার কোম্পানিগুলোও নামমাত্র তার ব্যবহার করছে। ওসবের কারণে প্রতিনিয়ত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। আর যারা কেমিক্যাল সংরক্ষণ ও গুদামজাত করে তাদের এ সম্পর্কে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা না থাকা, বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ না করা এবং ফায়ার সার্ভিসকে এ বিষয়ে না জানানোর কারণে বড় ধরনের অগ্নিদুর্ঘটনাগুলো ঘটছে। ওসব কেমিক্যাল থেকে লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের যে রাসায়নিক থাকা দরকার, তার স্বল্পতা রয়েছে। যে কারণে কেমিক্যালের আগুন ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। রাসায়নিক কিংবা কেমিক্যাল বিক্রিয়া হলে তা কত দ্রুত ছড়িয়ে যেতে পারে এবং এ ধরনের আগুন নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা যেতে পারে তা পরীক্ষা করতে ফায়ার সার্ভিস বহু আগে একটি ল্যাবের প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু আদৌ তা হয়নি।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খান গণমাধ্যমকে জানান, বড় ধরনের দুর্ঘটনাগুলো মূলত কেমিক্যাল বিস্ফোরণে ঘটে থাকে। অতীতেও এমনটি হয়েছে। দেশে কেমিক্যালের ব্যবহার যতো বাড়ছে, অগ্নি ঝুঁকিও ততোই বেড়ে চলছে।

সব খবর