ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৬ই অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১০ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি, রাত ৮:৪৭
বাংলা বাংলা English English

বৃহস্পতিবার, ৬ই অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ডিজিটাল যুগে বড় বেকায়দায় পড়েছে সাংবাদিকতা


(লেখক: বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট.. মোল্লা তানিয়া ইসলাম তমা)

 

তথ্য প্রযুক্তি ও ডিজিটাল যুগে বড় বেকায়দায় পড়েছেন দক্ষ এবং সত্যিকারের সংবাদকর্মীরা । সত্যিকারের সাংবাদিকতার মধ্যে এখন চরম ধরনের পাইরেসি চলছে। কপি পেস্ট করার কারনে একটি সংবাদেই ঘুরছে অসংখ্য মিডিয়ায় । জদিওবা প্রায় প্রতিটি অনলাইন পোর্টালে লেখা থাকে (…ডট নেট …২৪.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাডা ব্যবহার করা যাবে না)
কিন্তু কে শোনেন, কে বোঝেন আর কে মানে এ নীতি নির্দেশ। প্রথম সারির হাতেগোনা কয়েকটি অনলাইন ভিত্তিক নিউজ পোর্টালে রিপোর্ট আপলোড হয়েছে, ব্যাস এখন কপি করে শুধু হেড লাইন পরিবর্তন করে নিজের নামে ফাইল পাঠাতে পারলেই হলো। ঐ সংবাদটি পাঠানোর পর তাদের অনলাইনে আপলোড হলেই মস্ত বড় এক ‘বিশিষ্ট সাংবাদিক’ বনে জান । কিন্তু মস্ত বড় সাংবাদিক সাহেব- সাহেবা আপনি একবার কি ভেবে দেখেছেন, যিনি সংবাদটি প্রথম লিখেছেন তিনি ঠিক তথ্যর ভিত্তিতে সংবাদটি করেছেন কি না? সাংবাদিকতায় দায়িত্বশীল ও প্রভাবশালী অনলাইন গুলোর প্রতিটি সংবাদকর্মী বা প্রতিবেদক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিশ্চিয়তার বিষয় ও তাদের বক্তব্য নিয়ে সংবাদ তৈরী করে থাকেন । কিন্তু এখানে ঐ সকল সংবাদকর্মী বা সাংবাদিক বিষয়টি তুচ্ছ মনে করে একই সংবাদ পাঠাচ্ছেন তাদের অনলাইন পোর্টাল বা পত্রিকায় । কয়েক বছর ধরেই লক্ষ করা যাচ্ছে সাংবাদিকদের মধ্যে চলছে এখন এক ধারনের কপি পেস্ট প্রতিযোগিতা । মুলত সাংবাদিকতায় কপি পেস্ট করাকে আমি মনে করি অপসাংবাদিকতা বা চুরির সাংবাদিকতা ! কিন্তু সাংবাদিক হিসেবে প্রত্যেক সাংবাদিকেরই তো দায়িত্বরোধ রয়েছে যে ‘সংবাদকর্মী বা সাংবাদিক জাতির মান- সম্মান রক্ষা করার ।

আমি একজন ক্ষুদে সংবাদকর্মী । শখের বশে ২০১৩ সালের দিকে (৬ষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী থাকা কালীন) টুকটাক লেখালেখি শুরু করি । এরপর থেকে লেখার ব্যাপরে কখনো পিছপা হইনি । এখনো দিনরাত চেষ্টা করি কোন একটা বিষয় নিয়ে কিছু লেখার । পড়ালেখার লেখার পাশাপাশি সার্বক্ষণিক চেষ্টা করি কোন বিষয় নিয়ে ফিচার বা সংবাদ লেখার । তাই আমাকে সবসময় একটু ব্যাস্ত থাকতে হয় । সংবাদ লেখার ক্ষেত্রে কখনো কারও উপর তেমন নির্ভরশীল ছিলাম না এমন কি এখনো না । নিজে যে ভাবে যা লিখতে পারি তাই লিখে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রেরন করি । কিন্তু কারো লেখা চুরি বা কপি পেস্ট করার চেষ্টা করিনা । ফিচার-প্রতিবেদনের জন্য সরেজমিনে অনেক বেশি সময় দিতে হয়। তবে ঘটনার উপরেই নির্ভর করে একজন সংবাদকর্মীকে ঘটনাস্থলে যাওয়ার প্রয়োজন আছে কিনা। ঘটনাধর্মী সংবাদের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা, লাশ উদ্ধার, মাদক উদ্ধার, সংঘর্ষ, হামলা, মামলা, গ্রেফতার, অগ্নিকা- ইত্যাদি সংবাদ গুলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রত্যক্ষদর্শীর নিকট পাওয়া তথ্যের উপর পুলিশ, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের নিকট ফোন করে নিশ্চিত হয়েই সংবাদটি লিখে দ্রুত সংবাদ মাধ্যম অফিসে পাঠাতে হয় । একটি সংবাদ তৈরী করতে একজন সংবাদকর্মীকে অনেক ব্যস্ত সময় পার করতে হয় । তথ্য সঠিক কিনা যাচাই-বাছাই তার পরে কম্পিউটারে মাথা খাটিয়ে সংবাদ তৈরী করতে হয়। আর বর্তমান ডিজিটাল যুগে সাংবাদিক নামধারী একটি চোরের গ্রুপ আরাম আয়েসে বসে থাকেন কখন কোন সংবাদ কোন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ বা আপলোড হলো । অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে আপলোড হলেই ‘কপি টু পেস্ট’ হয়ে অন্য কোনো ‘বিশিষ্ট’ সাংবাদিকের নামে একই সংবাদ, একই হেডলাইনে, একই শব্দে, একই ছন্দে তাদের সংবাদ মাধ্যমে পাঠাচ্ছেন। মজার বিষয় হলো, এসব নামধারী চোর সংবাদকর্মীগন যেভাবে সংবাদটি পাঠালেন ঠিক সেইভাবেই সংবাদটি আপলোড করলেন সংশ্লিষ্ট সংবাদ মাধ্যমের ডেক্সের দায়িত্বরতরা । সংবাদকর্মীর পাঠানো সংবাদে কোথায় ভুল বানান, কোথায় শব্দের পরিবর্তন বা সংযোজন হবে তাও লক্ষ করেন না ডেক্সের দায়িত্বরতরা।
এসব যারা করেন তারা আবার ফেসবুকেও সংবাদটি পোস্ট করতে অভ্যস্ত । অনলাইনের পাঠক ও ফেসবুকের বন্ধুরাও ঐ সংবাদটি পড়ে, বুঝে নিতে বাধ্য, যে আহা বেচারা সংবাদিক কত ভালো না রিপোর্ট করেছেন । আবার প্রকাশ হওয়া সংবাদটি দেখার জন্য অন্য সংবাদকর্মীদের ফোন করে আনন্দের সঙ্গে জানান, আজকে আমার পাঠানো সংবাদটি কত বড় আর যত্ন সহকারে প্রকাশ করেছে । ঐ সকল সাংবাদিক সাহেব- সাহেবাদের কাছে আমার প্রশ্ন রইল? আপনারা একবারও ভেবে দেখেছেন কি, ঘটনা ঘটার পর যিনি প্রথম (সংবাদকর্মী) সংবাদটি তৈরী করেছেন তার একটি লাইন লিখতে কতবার ভুল হয়েছিল, কতবার তাকে লাইনের শব্দ পরিবর্তন সংযোজন করতে হয়েছে। আর কতবারেই বা সংশ্লিষ্ট সকলের মতামত ও বক্তব্য নেওয়ার জন্য মোবাইলে কল করতে হয়েছে। আমি দেখেছি অনেক সময় তথ্য পাওয়ার পর সংবাদ তৈরী করে আমার সংবাদ মাধ্যমে পাঠিয়ে দিয়েছি । কিন্তু একটু পর জানতে পারলাম আমার পাঠানো তথ্যটি অনেক ভূল রয়েছে । এরপর সংবাদটি ঐ মুহুর্তে অনলাইন ভার্সনে আপলোডও হয়েছে । তখন চাকুরী হারানোর ভয়ে অনেক সময় সংশোধনী না দিয়ে পরবর্তীতে সম্ভব হলে ফলোআপ একটা সংবাদ করি । আর আপনারা খোঁজখবর না নিয়ে আপলোড হওয়া ঐ ভূল সংবাদটি কপি করে অন্য সংবাদ মাধ্যমে পাঠাচ্ছেন। এটা কতটুকু ঠিক, একবার ভেবে দেখবেন? এছাড়া অনেক সময় একটি ঘটে যাওয়া ঘটনার সংবাদ তৈরীতে তথ্য পাওয়া কষ্টকর হয়, স্থানীয় বা সংশ্লিষ্টদের কাছে ফোন করেও তেমন কোনো তথ্য বা বিষয়টির পুরিপূর্ণ নিশ্চিয়তা দিতে পারেন না। এরকম সংবাদ তৈরী করতে কতবার যে পরিবর্তন সংযোজন আবার কতবার যে কম্পিউটারের কি বোর্ড এবং মাউসে হাত ফেলতে হয় তারও হিসেব থাকেনা । আমার এ লেখাটি পড়ে অনেকে আমাকে গালি দিবেন, অনেকে সমালোচনা করবেন। আবার কেউ বলবেন আমি নাকি খুব বড় সাংবাদিক হয়ে গেছি । আসলে না এধরণের লেখা লিখতে আমারও লজ্জা করে। কারণ আমরা তো সবাই একই গোষ্ঠির! কিন্তু কিছু বিষয় লক্ষ করে আর মেনে নিতে পারছিনা। আমার মনের রাগ আর যন্ত্রণা থেকে লেখাটি লিখলাম। আমি ওইসব সংবাদকর্মীদের বলব আপনারা যে যাই পারেন লেখার চেষ্টা করেন।
আপনাদের কারনে মূলধারার সাংবাদিকতায় অনেকটা জটিলতা বেড়েছে । অনেক গুণী সাংবাদিক আজ নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিতে লজ্জা পাচ্ছেন । সাংবাদিক মানে জাতির বিবেক, সাংবাদিক মানে দেশ প্রেমিক, সাংবাদিক মানে কলম সৈনিক, সাংবাদিক মানে সমাজের দর্পণ, সাংবাদিক মানে জাতির সেবক, সাংবাদিক মানে সম্মানিত, সাংবাদিক মানে তদন্তকারী, সাংবাদিক মানে আইন বিষয়ে জানা, সাংবাদিক মানে সহযোগিতা করা, সাংবাদিক মানে সকল অফিস আদালতের নিয়মনীতি মেনে স্বাধীন ভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালন করা । বর্তমানে মূলধারার সাংবাদিক আর কপি পেস্ট সাংবাদিক দেখে চেনা- জানা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই সাংবাদিকতা পেশায় বাড়ছে বিভিন্ন জটিলতা। অনেকেই সংবাদ লিখতে পারেন না তবুও সে সাংবাদিক! এর কারণে প্রকৃত সাংবাদিকদের লজ্জা । দেশ ও জাতির নিরাপত্তা ও কল্যাণে বর্তমানে অনেক উন্নত হয়েছে দেশ। “পুলিশ জনগনের বন্ধু” জনতাই পুলিশ, পুলিশই জনতা। জনগণের সেবায় কাজ করছেন যে পুলিশ ও সাংবাদিক-তারা বেশি ঝুঁকি নিয়ে জীবনযাপন করছেন। কিছু অসাধু লোকের ভুলের কারণে অন্যদের কেন বদনাম হবে? তেমনি কিছু ভুয়া ও অপসাংবাদিকতার কারণে প্রকৃত সাংবাদিকদের বদনাম হচ্ছে, এর অর্থ কি জানা প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি । অন্যের লেখা কপি করে সাংবাদিকতা করবেন না। আপনারও তথ্য সংগ্রহ করুন, সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে মতামত নিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত হন। অপরের উপর নির্ভরশীল হয়ে সাংবাদিকতা করার চেয়ে দালালি করা অনেক ভালো হবে। আমি প্রকৃত ও দক্ষ সাংবাদিক ভাই ও বোনদের কাছে ক্ষমা চাই এ কারণে যদি অযাচিত কিছু লিখে থাকি। তবে যারা কপি পেস্ট করে সংবাদকর্মী সেজেছেন তাদের কাছে নয়!

সব খবর