বই হচ্ছে খাবারের মতো। কিছু খাবার শুধু স্বাদ বোঝার জন্য মুখে দিতে হয়, কিছু খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো বিধায় স্বাদ ভালো না হলেও গিলে ফেলতে হয়। আর কিছু খাবার আছে যা আয়েশ করে স্বাদ উপভোগ করতে করতে খেতে হয়।
বিখ্যাত ‘ইউটেলিটারিয়ান’ প্রাবান্ধিক ফ্রান্সিক বেকন ‘অফ স্টাডিজ’ এ বই পড়ার বেশ কয়েকটি দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন, যা উত্তরাধুনিক সময়ে এসে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক।
ইউটেলিটারিয়ান শব্দটিকে ব্যবচ্ছেদ করলে ইংরেজি ইউটিলিটি শব্দটি পাওয়া যায়; যার বাংলা অর্থ উপযোগিতা। একজন পাঠক বই পড়লে সেখান থেকে তিনি কী পেতে পারেন, ভালো কিছু পাওয়ার জন্য কোন ধরনের বই পড়া উচিত, কতক্ষণ বই পড়া উচিত, বইয়ের বাণী ও জ্ঞান কীভাবে, কোথায়, কতটুকু ব্যবহার করা উচিত এর বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায় বেকনের নাতিদীর্ঘ এ প্রবন্ধে।
পুঁজিবাদ ভালো নাকি খারাপ এ আলোচনায় না গিয়ে, এমন এক পুঁজিবাদী সমাজে মানুষের বসবাস যেখানে সবকিছু পণ্য- এই সত্যিটা মেনে নেয়া বেশি সুবিধাজনক। পণ্যের কথা বললেই যে দুটি শব্দ সামনে চলে আসে তা হচ্ছে- চাহিদা ও উপযোগিতা। একটি পণ্যের উপযোগিতা না থাকলে সেটার চাহিদাও থাকে না। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, বইয়ের উপযোগিতা আসলে কী? বই পড়ে কী আসলেই কোনো উপকার হয়? কী লাভ একটি উপন্যাস কিংবা গল্প পড়ে?
বই মানুষের সবচেয়ে ভালো বন্ধু- এ কথা সর্বজনস্বীকৃত। কিন্তু কথাটি বিশ্লেষণ করতে গেলে শুরুতেই ব্যাখ্যার দাবি রাখে মানুষের জীবনে ভালো বন্ধুর ভূমিকা নিয়ে। একজন ভালো বন্ধু মানেই ভালো সঙ্গ-সময়, ভালো পরামর্শদাতা-পথপ্রদর্শক, সর্বোপরি জীবনের একটি সুন্দর মানচিত্র এঁকে দেয়ার সহশিল্পী।
যেহেতু বই একটি জড় বস্তু, তাই বইকে ভালো বন্ধু হিসেবে কাজে লাগানোর দায়িত্বটা মানুষের ওপরেই। এর সর্বোচ্চ উপযোগিতা নির্ভর করছে পাঠকের ব্যবহারের ওপরে। পৃথিবীর সব মানুষ যেমন ভালো বন্ধু হয় না, পৃথিবীর সব বইও জ্ঞানের আধার কিংবা জীবনমুখী শিক্ষার দিকপাল হয় না।
পৃথিবীতে ঠিক বইয়ের সংখ্যা কত তা যদি বাদও দেয়া হয়, বাংলা ভাষায় এখন পর্যন্ত ঠিক কতটি বই লেখা হয়েছে কিংবা আরও ছোট পরিসরে বললে, কতজন লেখক আছে বাংলা ভাষায়- তা সঠিক সংখ্যায় বলা এক রকমের অসম্ভব।
এত শত বইয়ের মধ্যে লাইন ধরে প্রতিটি বই শেষ করতে গেলে জীবন পার হয়ে যাবে, কিন্তু বই আর শেষ হবে না। জীবনের নিষ্ঠুরতম সত্যটি হচ্ছে, হাতে সময় অল্প কিন্তু পড়ার মতো বই অনেক। এক্ষেত্রে বেছে নিতে হবে কোন বইটি পড়তে হবে আর কোনটি বাদ দিতে হবে। পড়ার বইগুলোর মধ্যে বেছে নিতে হবে কোন বইটি ভালোভাবে পড়তে হবে আর কোনটিতে কেবল চোখ বুলিয়ে নিলেই চলবে। এর মধ্যে কিছু বই পড়তে হবে কেবল আনন্দের জন্য, কিছু বই পড়তে ভালো না লাগলেও জীবনে এর উপযোগিতার ফল পেতে পড়তে হবে। আর কিছু বই আনন্দ ও উপযোগিতা উভয়ের জন্য পড়তে হবে।
এজন্য বেকন বলেছেন, ‘কিছু বই কেবল স্বাদ নেয়ার জন্য। কিছু বই গিলে খাবার জন্য। আর কিছু বই স্বাদ নিয়ে, আয়েশ করে গিলে খেয়ে একেবারে হজম করার জন্য।’
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে কোন্ বই কীসের জন্য। এটি নির্ভর করে কে কোন্ ধরনের বই পছন্দ করেন এবং কে কোন্ ধরনের জ্ঞান কাজে লাগাতে পারেন তার ওপর। খাবার স্বাদ নেয়ার পরেই মানুষ ঠিক করেন কোনটি তার পছন্দের আর কোনটি অপছন্দের। আবার পছন্দ হওয়ার পরও মানুষ পারিপার্শ্বিক জ্ঞান বিবেচনায় বুঝতে শেখে কোনটি উপকারী ও কোনটি ক্ষতিকর। কিছু খাবার হয়তো স্বাদহীন কিংবা কিছু ক্ষেত্রে তেঁতো; কিন্তু স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বিধায় খেতে হয়। এত বাছবিচারের পরে মানুষের জীবনে খুব কম খাবারই থাকে যা স্বাদ ও স্বাস্থ্য দুটির জন্যই ভালো। বই বিচারের ব্যাপারটিও প্রায় একই রকম।
বাজারে কিছু সস্তা মানের উপন্যাস কিংবা গল্প যা পড়ে আনন্দ পাওয়া যায়, কিন্তুর শেখার কিছু নেই; সেগুলো দুএকটা নিছক আনন্দের জন্য পড়া যেতে পারে। কিন্তু কেউ যদি দেদারছে এসবই পড়তে থাকে তাহলে পাঠক হিসেবে সেও বাজারি লেখকদের মতো নিম্নমানের হয়ে পড়বে। আবার কিছু বই যা পড়তে ভালো লাগে না যেমন- কাটখোট্টা পাঠ্যপুস্তকের বিশেষ কোনো বিষয়। কিন্তু পরীক্ষায় পাস করার জন্য নাক-মুখ চেপে ওষুধ গেলার মতো সেসব বিদ্যা গেলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। যদিও এ আদর্শ প্রমথ চৌধুরির ‘বই পড়া’ প্রবন্ধের মূলভাবের সঙ্গে প্রবঞ্চনার শামিল কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে কিইবা করার আছে। একমাত্র কিছু বই আছে যা পড়ে আনন্দ ও শিক্ষা দুটিই পাওয়া যায়। একজন পাঠকের প্রধান দায়িত্ব সেসব বই খুঁজে বের করা, সংগ্রহ করা, পড়া ও জীবনে কাজে লাগানো।
বেকনের অফ স্টাডিজ প্রবন্ধে বই পড়ার তিনটি সুবিধার কথা বলা হয়েছে। তবে সুবিধার পাশাপাশি অসুবিধার দিকটিও তুলে ধরেছেন বেকন। প্রথমত, বই পড়ে আনন্দ পাওয়া যায়, তবে আনন্দের জন্য সারাদিন বই পড়া অলস মানুষের লক্ষণ। দ্বিতীয়ত, বই একজন মানুষের ভাষাকে সমৃদ্ধ করে। বই থেকে পাওয়া শব্দ ও বাক্যের বিন্যাস মানুষ অলংকারের মতো ব্যবহার করতে পারেন। তবে অলংকার ব্যবহারের একটা সীমা থাকা উচিত। কেউ সারা শরীর গহনা দিয়ে মুড়িয়ে রাখলে তাকে সুন্দরের বদলে জবড়জংই লাগবে বেশি। তেমনি শব্দের আঁতলামি না করে স্থান ও কালভেদে তার সঠিক ব্যবহারের দিকে জোর দিয়েছেন বেকন। সবশেষ সুবিধা হচ্ছে, বই থেকে গৃহীত জ্ঞান মানুষকে যোগ্য করে তোলে। তবে বইয়ের জ্ঞানই শেষ কথা না। বইয়ের প্রতিটি বাণীকে আসমানি কিতাবের মতো ধ্রুব সত্য না মেনে বই ও বাস্তবের মিশেলে তৈরি অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের ব্যবহারের দিকে জোর দিয়েছেন এ প্রাবন্ধিক।
এবার প্রশ্ন উঠতে পারে মানুষের কাছে বইয়ের মূল্য কতটুকু তা নিয়ে। এর উত্তর নির্ভর করছে মানুষটি কেমন তার ওপরে। যার জীবন কেটেছে বইয়ের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ঠোঙা বানিয়ে কিংবা আড়তদারির ব্যবসা করে; সাদাচোখে দেখতে গেলে বই পড়ে জ্ঞান আহরণে তার আগ্রহ থাকার কথা না। বেকনের মতে, ক্ষেত্রবিশেষে এমন কাটখোট্টা মানুষের কাছে বই পড়ার মতো ব্যাপারটি এক রকমের নিন্দনীয় কাজ।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষের কাছে বইপড়া প্রশংসনীয় একটি কাজ। কারও প্রতিনিয়ত বই পড়ার অভ্যাস আছে শুনলে এ শ্রেণির মানুষ বুঝে হোক আর না বুঝে হোক বাহবা দিতে ভালোবাসেন। কিন্তু জ্ঞানী তারাই যারা বই পড়ে বইয়ের জ্ঞানটুকু নিজের জীবনে কাজে লাগাতে পারেন।
মানুষের জীবন পরিপূর্ণ না। প্রত্যেকের জীবনেই রয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতার গহ্বর। এই গহ্বর পূরণে বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। যেমন একজনের পক্ষে হয়তো মিশরের পিরামিড ঘুরে দেখা কিংবা কায়রোর রাস্তায় বসে চা খাওয়া সম্ভব না। কিন্তু মিশর নিয়ে জানার ব্যাপক আগ্রহ পূরণের সবচেয়ে ভালো মাধ্যম মিশর নিয়ে কোনো ভ্রমণকাহিনী কিংবা ইতিহাসের বই পড়া। আবার মিশরের মানুষের জীবনযাত্রা জানতে সে দেশের কোনো লেখকের বই পড়া। হতে পারে এটি সৈয়দ মুজতবা আলীর ভ্রমণকাহিনী কিংবা মিশরীয় লেখক নাগিব মাহফুজের কোনো বই।
আবার কেউ হয়তো সমাজতন্ত্র নিয়ে কার্ল মার্কসের কোনো লেখা পড়ছেন। কিন্তু এর বাস্তবিক প্রয়োগ কেমন কিংবা পুঁজিবাদ ভালো নাকি সমাজতন্ত্র এটা জানতে পড়ার পাশাপাশি আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে পড়ুয়া কোনো বন্ধু থাকলে ও আড্ডায় বসে নিজের পড়া বইগুলো নিয়ে আলোচনা করলে তাত্ত্বিক বিষয়গুলো যেমনি পাকাপোক্ত হয়, পাশাপাশি এর ব্যবহারিক জ্ঞান সম্পর্কেও সম্যক ধারণা লাভ করা যায়।
শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক নিয়ে একটি গল্প প্রচলিত আছে। তিনি একবার কোনো কিছু পড়লে সেই পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলে দিতেন এবং সেখানে থাকা মূল সারটুকু হুবহু বলে দিতে পারতেন। প্রচলিত গল্পটির সত্যি-মিথ্যা বিচার না করে এ কথা হলফ করে বলা যায়, এমন মুখস্তবিদ্যা অনেকেরই নেই। এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা হাজারখানেক বই পড়েছেন ঠিকই, কিন্তু তেমন কিছুই মনে রাখতে পারেননি। মনে রাখার চাবিকাঠি হচ্ছে লিখে রাখা। এ ব্যাপারে বিখ্যাত লেখক আহমদ ছফার গুরু জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাকের একটি উপদেশ গ্রহণযোগ্য। তিনি ছফাকে বলেছিলেন, জমি চাষের পর লাঙল দিয়ে যেমনি দাগ কেটে রাখা হয়, বই পড়ার পরও তেমনি নোট করে রাখা উচিত। না হলে কি পড়া হয়েছে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ লাইন কী তা মনে রাখা এক রকমের অসম্ভব। বই পড়ে মনে রাখার ভালো উপায় হচ্ছে, পড়ার পর বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ উদ্বৃতি ও সারাংশ লিখে রাখা। এতে করে বিদ্যার যেমনি একটি মানচিত্র থাকে, পঠিত বইয়েরও তেমনি একটি সঠিক হিসাব থাকে। সবচেয়ে ভালো হয়, পঠিত বই সম্পর্কে নিজের একটি ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ লিখে রাখতে পারলে। এটি যেমনি বইটিকে মগজে গেঁথে রাখে তেমনি বইটির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় সম্পর্কে নিজের একটি ব্যক্তিগত দালিলিক প্রমাণও থাকে।
এজন্য বেকন বলেছেন, একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হতে হলে পড়তে হবে, একজন সদাপ্রস্তুত মানুষ হতে হলে যা পড়া হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করার মতো দক্ষতা থাকতে হবে, আর সর্বেসর্বা হওয়ার জন্য পঠিত জ্ঞানকে নিজের মতো করে লেখার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।
বইয়ের বিষয়ভিত্তিক উপযোগিতা নিয়ে বেকন বলেছেন, কেউ মনোযোগ বাড়াতে চাইলে তার গণিতের বই পড়া উচিত। অন্যদিকে জ্ঞানের জন্য ইতিহাস, গভীরতার জন্য দর্শন, যুক্তির জন্য যুক্তিবিদ্যা বা আইন ও চমৎকার বিদগ্ধের জন্য কবিতার বই পড়ার পক্ষে অভিমত জানিয়েছেন এ প্রাবন্ধিক।
কোন ধরনের বই দিয়ে পঠন অভ্যাসের প্রাথমিক পর্বটি শুরু করা উচিত-এমন প্রশ্নে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড লাস্কি জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাককে গোটা একটা লাইব্রেরিতে ছেড়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমার যেটা পড়তে ইচ্ছা হয় সেই বই দিয়ে শুরু করো।’ পাঠকদের ক্ষেত্রেও প্রথম উপদেশ হচ্ছে লাইব্রেরি, বইমেলা ও বইয়ের দোকানগুলোতে কয়েকদিন ঘুরে দেখা- কোন ধাচের বইগুলোতে ব্যক্তিগত আগ্রহ জন্মে। পরে সেখান থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া কোন বইটি দিয়ে পাঠক জ্ঞানের সাগরে সাম্পান ভাসিয়ে এগিয়ে যেতে চান সামনের দিকে।