ঢাকা, বুধবার, ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৮ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ১১ই শাবান, ১৪৪৫ হিজরি, দুপুর ১:৫৪
বাংলা বাংলা English English

নারায়ণগঞ্জে বাণিজ্যিক ভবনে বিস্ফোরণ: নিহত ১, আহত ১২


১৮ মার্চ, ২০২৩ : জেলার নিতাইগঞ্জের ডাইলপট্টি এলাকায় একটি বাণিজ্যিক ভবনে বিস্ফোরণের পরে ধ্বসে পড়া ভবনের অংশের চাপায় আওলাদ হোসেন (৪০) নামের একজন নিহত ও ১২জন আহত হয়েছে।
শনিবার সকাল সাড়ে ৮টায় বিস্ফোরণ ও এর কিছুক্ষণ পরে ভবনের একাংশ ধ্বসে পড়ার ঘটনা ঘটে। ভবনটি শতাধিক বছরের পুরনো। আগুন লেগে ও পরে আগুন নেভানোর পানিতে এ ভবনের সাতটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার বস্তা ডাল, লবন, মসলা অন্যান্য খাদ্য সামগ্রী নষ্ট হয়ে গেছে।
নগরীর ২৫ নং আর কে দাশ রোড হোল্ডিংয়ের ধ্বসে পড়া দো’তলা ভবনের এক তলায় সাতটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অবস্থিত। দো’তলা পরিত্যাক্ত। ভবনের দক্ষিণ অংশের ভাড়াটিয়া গরিবে নেওয়াজ সল্টের মালিক জামাল দেওয়ান জানান, রোজার আগের দিনগুলিতে বেশি বেচা-কেনা হওয়ায় তিনিসহ ব্যবসায়ীরা অন্যদিনের চাইতে একটু আগেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আসেন। সকাল সাড়ে ৮টায় ভবনের উত্তর অংশের ভাড়াটিয়া রাজলক্ষী ভান্ডারের মালিক রাজন দোকান খুলে পূজা করার জন্য আগড়বাতি জ্বালানোর চেষ্টা করে। এসময় তার কক্ষে প্রচন্ড বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের পরপরই এ ভবনে আগুন লেগে যায়। এলাকাবাসী দৌড়ে গিয়ে তাকে ও পাশের গোবিন্দ ভান্ডারের মালিক বিষ্ণুপদ সাহাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। বাইরে আনার কিছুক্ষণের মধ্যে ভবনের রাজলক্ষী ভান্ডারের অংশসহ উত্তর অংশ ধ্বসে পড়ে। এসময় ভবনের পাশ দিয়ে বেশ কয়েকজন লোড-আনলোড শ্রমিক যাচ্ছিলেন। তারা আহত হন। তিনি জানান, এই ভবনটি অনেক বছরের পুরাতন। এই দোকানের নিচ দিয়ে গ্যাসের লাইন ও স্যুয়ারেজের লাইন আছে। প্রায়ই গ্যাসের পাইপে লিকেজ হয়ে দোকানে গ্যাস ঢুকতো। এর আগেও একবার এখানে আগুন লেগেছিলো।
প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিক মনসুর মিয়া জানান, বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়। এসময় প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে একজন ট্রাক চালক ও হেলপার দাঁড়িয়ে ছিলেন। বিস্ফোরণের ফলে ভবনের চালটা ছিটকে গিয়ে তারা আহত হন। বিস্ফোরণের পরপরই ওই ভবনে আগুন ধরে যায়।
নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারি পরিচালক ফকর উদ্দিন আহমেদ জানান, খবর পেয়ে ফায়ার ব্রিগেডের সাতটি ইউনিট এসে আগুন নেভানো শুরু করে। বেলা ১০টা পঁচিশ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ভবনটি অত্যন্ত পুরনো হওয়ায় এর একটি অংশ ধ্বসে পড়েছে। বাকি অংশও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। ভবনের ভেতরে ভুষা মাল, কাগজের ঠোঙ্গাসহ বিভিন্ন জিনিসে আগুন সহজে ছড়িয়ে পড়ে। আগুন লাগার সঠিক কারণ তদন্তের পরে বলা যাবে জানিয়ে তিনি বলেন, ভবনের ভাড়াটিয়ারা দাবি করছে গ্যাস লাইনের লিকেজ বা ড্রেনের গ্যাস থেকে আগুন লাগতে পারে। আমরা এ বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছি।
নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালের আর এম ও ডা. ফরহাদ হোসেন জানান, হাসপাতালে এ ঘটনায় আহত আওলাদ হোসেন, জগদীশ চন্দ্র, মোহাম্মদ হোসেন, রবীন্দ্র দত্ত, রেজাউল করিম, জাহাঙ্গীর হোসেন, শান্ত, রিজন, মামুন, চিকিৎসা নেন। পরে এদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
উল্লেখিতদের বাইরে ফায়ার সার্ভিসের তালিকানুযায়ী হজরত, সরদার ও সেন্টু নামের আরো তিনজন আহত হয়।
নারায়ণগঞ্জ সদর থানার ওসি আনিচুর রহমান জানান, আহতদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে নেয়ার পর আওলাদ হোসেন মারা যান। আওলাদ হোসেন একজন লোড-আনলোড শ্রমিক ছিলেন। তার বিস্তারিত ঠিকানা এখনো জানা যায়নি।
ভবনটির ভাড়াটিয়া জামাল দেওয়ান জানান, এলাকাটি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের পনেরো নং ওয়ার্ডে পড়েছে। এ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অসিত বরণ বিশ্বাস জানান, ভবনটির মালিক ইলিয়াস দেওয়ান। তিনি ঢাকার বনানীতে থাকেন। বেশ কয়েক বছর আগেই এ ভবনকে সিটি কর্পোরেশন ঝুঁকিপূর্ন ও ব্যবহারের অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করে। তাকে তিনবার এ ভবন ভেঙ্গে ফেলার জন্য চিঠি দেয়া হয়। কিন্তু তিনি ভবন ভাঙ্গেননি। এ ভবনে আগেও একবার একই ধরনের আগুন লাগার ঘটনা ঘটে।
ভবন না ভাঙ্গার কারন জানতে ইলিয়াস দেওয়ানের মোবাইল ফোন নাম্বারে বেশ কয়েকবার ফোন দেয়া হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তার মামাতো ভাই ভবনের ভাড়াটিয়া জামাল দেওয়ান জানান, ভবন ভাড়া নেয়ার জন্য তিনি বিশ লাখ টাকা এডভান্স দিয়েছেন। একইভাবে এ ভবনের আটটি ভাড়াটিয়া কেউ বিশ কেউ ত্রিশ বা আরো বেশি টাকা এডভান্স দিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী ভবন ভাঙ্গলে এই টাকা ফেরত দেয়ার কথা। কিন্তু ভবন মালিক ইলিয়াস দেওয়ান ব্যবসায়ে মার খেয়ে যাওয়ায় এ টাকা ফেরত দিতে পারছেন না। আগে তার একটি ময়দার মিল ও একটি লবনের মিল থাকলেও বড় গ্রুপগুলোর সাথে ব্যবসায় না পেরে দুইটিই বন্ধ। ভাড়াটিয়াদের টাকা ফেরত দিতে না পারায় তিনি ভবনও ভাঙ্গতে পারছেন না।
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের টাউন প্লানার মাঈনুল ইসলাম জানান, ‘আমরা বেশ কয়েক বছর আগে এরকম বেয়াল্লিশটি ভবনের তালিকা তৈরী করি। কিন্তু এসব ভবন ভাঙ্গার ক্ষেত্রে আইনগত বাধা, ভবন মালিকদের অংশিদারিত্ব নিয়ে সমস্যা এমনি নানা সমস্যা থাকে। এজন্য ভাঙ্গা যায়নি। এ ভবনটি কি ধরনের সমস্যার কারনে ভাঙ্গা হয়নি তা দেখে বলতে হবে। তবে আমরা এ ভবনটি দুই-একদিনের মধ্যে ভেঙ্গে ফেলার ব্যবস্থা করছি।’

সব খবর