ঢাকা, সোমবার, ১১ই ডিসেম্বর, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে অগ্রহায়ণ, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৫ হিজরি, ভোর ৫:৩৪
বাংলা বাংলা English English

সৌর সেচ প্রকল্পের সুবিধা পাঁচ্ছে না অধিকাংশ কৃষক


সৌর সেচ প্রকল্পের সুবিধা পাঁচ্ছে না দেশের অধিকাংশ কৃষক। অথচ ফসল ফলাতে বছর বছর সেচ নিয়ে কৃষকরা দুশ্চিন্তায় পড়ে। বিদ্যুৎ সংকট, লোডশেডিং ও লো ভোল্টেজের কারণে নিরবচ্ছিন্ন সেচ মিলে না। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিইএ) সূর্যের আলো থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের মাধ্যমে জমিতে সেচ দিতে প্রকল্প হাতে নেয়। কম দামে সেচ দেয়া, বছরে অন্তত তিনটি ফসল উৎপাদন, নবায়নযোগ্য ও কার্বন নিঃসরণহীন শক্তি উৎপাদন করে জলবায়ুর পরিবর্তন রুখতে দুটি প্রকল্প নেয়া হয়। তাতে কিছু এলাকায় সুফল মিললেও অব্যবস্থাপনার কারণে অধিকাংশ কৃষক পাঁচ্ছেন না সৌর সেচ প্রকল্পের সুবিধা। এমনকি সরকারের এ সেবা সম্পর্কে অনেকেই জানেনই না। বরং অনেক ক্ষেত্রে এ সেবা নিতে কৃষককে গুনতে হয় বাড়তি টাকা। কিছু এলাকায় সৌর সেচ পাম্প উদ্বোধনের পরই বন্ধ করে রাখা হয়েছে। ভুল ব্যবস্থাপনার কারণে আবার অনেক স্থানে পর্যাপ্ত পানি উঠছে না। তাতে মাঠে মারা যাচ্ছে সরকারের প্রায় দেড়শ কোটি টাকার দুই প্রকল্প। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিইএ) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে গত এক দশকে মাত্র ৩ হাজার সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত বাজেট ও নীতি সহায়তার অভাবে সম্ভাবনাময় পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ খাতে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি হচ্ছে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘সৌরশক্তি ও পানি সাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি (পাইলট)’ প্রকল্পটি ২০১৭ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়। প্রকল্পের আওতায় ৬৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০০ উপজেলায় ১০৫টি সোলার সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়। আর ৮২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ে বিএডিসির ‘সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ক্ষুদ্র সেচ উন্নয়ন’ প্রকল্পটি ২০১৮ সালের অক্টোবরে শুরু হয়ে এ বছরের জুনে শেষ হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয় ৩৪ জেলার ১৪১ উপজেলায়। সৌর বিদ্যুতে প্রতিটি সেচ পাম্প চালানোর জন্য স্থানীয়দের নিয়ে গঠন করা হয়েছে কমিটি। ওই কমিটি প্রতি শতাংশ জমির জন্য ৫০ টাকা করে সেচ খরচ নেয়। আর ওই কমিটি প্রতিবছর সরকারকে ১৫ হাজার টাকা করে কিস্তি পরিশোধ করে। সূত্র জানায়, মানিকগঞ্জের ঘিওরের সদর ইউনিয়নের পুরোনো ধলেশ্বরী নদীর উত্তরপাড়ে চর ঘিওর এলাকায় ২০২১-২২ অর্থবছরে ২০ লাখ ৬৬ হাজার ৬৯৭ টাকা খরচ করে একটি সৌরচালিত সেচ পাম্প বসানো হয়। এখন পাম্পটি অচল পড়ে আছে। ফলে সদর ইউনিয়নের চর ঘিওর এলাকার শতাধিক চাষি সেচ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সৌরচালিত পাম্পটি চালু না হওয়ায় এখন বিদ্যুৎচালিত পাম্পের মাধ্যমে সেচ দিতে গিয়ে বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। একইভাবে গাজীপুরের শ্রীপুরে নান্দিয়া সাংগুন গ্রামে মুখ থুবড়ে পড়েছে বিএডিসির সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ প্রকল্প। শীতলক্ষ্যা নদীতীরে বসানো সেচ পাম্পটির আওতায় জমি রয়েছে প্রায় ৫০ বিঘা। কিন্তু পাম্পটি নদীর কম গভীরে স্থাপন করায় নদীর পানি একটু নিচে নামলে আর পানি ওঠে না। ভোলার চরফ্যাসনের বিএডিসির প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে উপজেলার চারটি ইউনিয়ন। এর মধ্যে হাজারীগঞ্জ ও আবুবকরপুর ইউনিয়নে একটি করে ও আব্দুল্লাহপুরে দুটি পাম্প আছে। তবে এখানে সেচ সুবিধা পেতে কৃষককে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। প্রতি শতাংশ জমিতে সরকার ৫০ টাকা নির্ধারণ করলেও সেচ কমিটিকে দিতে হচ্ছে ৭০ টাকা। বরগুনার পাথরঘাটার মানিকখালী গ্রামে স্থাপনের দুই বছরেও চালু হয়নি বিএডিসি নির্মিত সোলার সেচ পাম্প। এমনকি পরিশোধ করা হচ্ছে না বার্ষিক ভাড়া ১৫ হাজার করে টাকাও। ২০২১-২২ অর্থবছরে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের ৯ নম্বর দক্ষিণ চর আবাবিল এলাকার বালুধুম গ্রামে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সৌর সেচ প্রকল্প শুরু করে। কিন্তু কৃষকের অভিযোগ, সোলারের বিদ্যুৎ দিয়ে যে পানি পাওয়া যায়, তা পর্যাপ্ত নয়। ফলে তাদের বাড়তি টাকা খরচ করে ডিজেলচালিত পাম্পের মাধ্যমে জমিতে সেচ দিতে হয়। সূত্র আরো জানায়, সেচ পাম্প সৌরবিদ্যুতে রূপান্তর করলে ৬ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। ১৩ লাখ ডিজেলচালিত সেচ পাম্প সৌরবিদ্যুতে রূপান্তর করলে বছরে সাশ্রয় হবে ১০ লাখ টন ডিজেল। বিদ্যুৎচালিত প্রায় ৩ লাখ ৬৫ হাজার সেচ পাম্পও সৌরবিদ্যুতে চালানো সম্ভব। এতে কমবে কৃষির উৎপাদন খরচ এবং কার্বন নিঃসরণ। একটি সোলার পাম্পে তিনটি শ্যালো পাম্পের কাজ হবে। সেই হিসাবে ২ লাখ ৬০ হাজার সৌরচালিত সেচ পাম্প বসানো গেলে আগামী ৫-৭ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে শতভাগ ডিজেলহীন সেচ চালু হবে। তবে সৌরচালিত সেচ মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য কাঠামোগত সক্ষমতা লাগবে। সেজন্য সরকারের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রকল্পটির উপপ্রকল্প পরিচালক অশোক কুমার বিশ্বাস জানান, পরীক্ষামূলক প্রকল্পটি শতভাগ সফল। কিছু ভুলত্রুটি থাকতে পারে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। তখন আমরা আগের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে কাজ করব। একই প্রসঙ্গে বিএডিসির প্রকল্পের পরিচালক মো. সারওয়ার হোসেন বলেন, সেচ পাম্প মূলত কৃষকদের মাধ্যমে গঠিত সমিতি পরিচালনা করে। আমরা শুধু তদারক করি। সৌর প্যানেল রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়। এসব কাজ স্থানীয়দের নিয়ে গঠিত কমিটির করার কথা। সার্বিক বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক জানান, বিষয়টি আমাদের কাছে একেবারেই নতুন। সোলার দিয়ে সেচ পুরোদমে চালু করতে আরো সময় লাগবে। পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ বা সৌরশক্তিচালিত সেচযন্ত্রে রূপান্তরের উদ্দেশ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীও সৌর সেচের ওপর জোর দিয়েছেন। সম্প্রতি একনেকে সৌরবিদ্যুতের আরেকটি প্রকল্প পাস হয়েছে।

সব খবর