ঢাকা, শনিবার, ১৩ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ২৯শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৭ই মহর্‌রম, ১৪৪৬ হিজরি, সকাল ১০:৫১
বাংলা বাংলা English English

রাজশাহী অঞ্চলে আমের অর্থনীতি বড় হলেও রফতানিতে ধস


রাজশাহী অঞ্চলে প্রতিবছর বাড়ছে আমের উৎপাদন। একই সাথে বড় হয়েছে আমের অর্থনীতি। দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রফতানিও হচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে রাজশাহী বিভাগের কয়েকটি জেলা আম উৎপাদনে আধিপত্য ধরে রেখেছে। তবে এইবার আম রফতানিতে ধস নেমেছে। অর্জন হয়নি লক্ষ্যমাত্রা।
কৃষি বিভাগ বলছে, প্রতিবছর আমের উৎপাদন বাড়ছে। এবছর আমের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৫৮ হাজার ৪৫০ মেট্রিকটন। বাজার মূল্য ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৫২৮ কোটি ২ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। তবে এবার এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। একই সাথে রফতানির লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হয়নি। রফতানিতে ধসের কারণ হিসেবে বৈরি আবহাওয়াকে দুষছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৮ হাজার ৪৫৯ হেক্টর জমিতে আবাদ হয় ৯৯ হাজার ৬২৭ মেট্রিকটন। ২০১২-১৩ ও ২০১৩-১৪ মৌসুমে প্রায় একই পরিমাণ আবাদ ও উৎপাদন হলেও ২০১৪-১৫ মৌসুমে আবাদ বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৫১৯ হেক্টর এবং ফলন হয় ২ লাখ ৫৭ হাজার ৫৩১ মেট্রিকটন। ২০১৫-১৬ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ১ হাজার হেক্টর জমিতে আমের আবাদ বৃদ্ধি পায় ঠিকই, কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও করোনাকালীন এ কয়েক বছরে উৎপাদন কমে যায় প্রায় ৫০ মেট্রিকটন। ২০২০-২১ মৌসুমে আবাদ হয় ১৭ হাজার ৯৪৩ হেক্টর এবং উৎপাদন আসে ২ লাখ ১৪ হাজার ৪৮৩ মেট্রিকটন আম। গেল বছর (২০২১-২২) ১৮ হাজার ৫১৫ হেক্টরে উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৬ হাজার ১৫৬ মেট্রিকটন আম এবং চলতি মৌসুমে (২০২২-২৩) রাজশাহীতে মোট ১৯ হাজার ৫৭৮ হেক্টর জমিতে আম চাষ হচ্ছে। এ বছর সম্ভাব্য উৎপাদন ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৪৫০ মেট্রিকটন।
উৎপাদন বৃদ্ধির কারণ হিসেবে কৃষিদপ্তর বলছে, আমের আধুনিক জাতের উদ্ভাবন ও শঙ্করায়ণ, অধিক হারে নার্সারি গড়ে ওঠা, শিক্ষিত বেকারদের কৃষিতে ঝুঁকে পড়া, অতি ঘন পদ্ধতিতে আমের চাষাবাদ, কৃষিতে সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনাসহ প্রভৃতি কারণে আমের আবাদ ও উৎপাদন বিগত বছরগুলোর চেয়ে অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়া গত মৌসুমে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আমের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় উৎপাদন ছিল কম। চলতি মৌসুমে আমের ফলন গেল বছরের তুলনায় বৃৃদ্ধি পেয়েছে ৫২ হাজার ২৯৪ মেট্রিকটন। এ বছর ২ লাখ ৫৮ হাজার ৪৫০ মেট্রিকটন সম্ভাব্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়।
তথ্যমতে, বিদেশে এবার আম রফতানি হয়েছে ৯ দশমিক ৯৬ মেট্রিক টন আম। টাকার হিসাবে আমচাষিদের আয় হয়েছে ৭ লাখ ২ হাজার ৯৫ টাকা। দেশের বাইরে সবচেয়ে বেশি আম রফতারি করা হয়েছে হিমসাগর। যা প্রায় ৫ মেট্রিক টন। এছাড়া গুটি জাতের বিভিন্ন আম, ল্যাংড়া, লক্ষণভোগ ও ফজলি আমও রফতানি করা হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম।
কিন্তু গত ১০ বছরের মধ্যে এবারে আম রফতানিতে সবচেয়ে বড় ধস নেমেছে। কৃষি স¤প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে আম রফতানি করা হয়েছিল ১৫ মেট্রিকটন। আয় হয়েছিল ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। ১৪-১৫ অর্থ বছরে আম রফতারি করা হয়েছিল ১৭ মেট্রিকটন, আয় হয়েছিল ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। ১৫-১৬ অর্থ বছরে রফতানি করা হয়েছিল ২৪ মেট্রিকটন, আয় হয়েছিল ১৯ লাখ ২০ হাজার টাকা। ১৬-১৭ অর্থ বছরে আম রফতানি হয়েছিল ৩০ দশমিক ১২ মেট্রিকটন। আয় হয়েছিল ২৪ লাখ ১০ হাজার ২৪০ টাকা। ১৭-১৮ অর্থ বছরে আম রফতানি করা হয়েছিল ২৫ দশমিক ২৩ মেট্রিক টন। ওই বছরে আয় হয়েছিল ২০ লাখ ১৮ হাজার ৪০০ টাকা। ১৮-১৯ অর্থ বছরে আম রফতানি করা হয়েছিল ৩৬ দশমিক ৪৪ মেট্রিকটন। আয় হয়েছিল ৩২ লাখ ৮০ হাজার ২৩০ টাকা। করোনা মহামারীর কারণে ১৯-২০ অর্থ বছরে কোনো আম রফতানি করা হয়নি। তবে ২০২০-২১ অর্থ বছরে ১৫ মেট্রিক টন আম রফতারি করা হয়েছিল। আয় হয়েছিল ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ২১-২২ অর্থ বছরে আম রফতারি করা হয়েছিল ২১ দশমিক ২৮ মেট্রিক টন। আয় হয়েছিল ১৯ লাখ ১৫ হাজার ২০০ টাকা।
রাজশাহী জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদন হয় বাঘা উপজেলায়। এই উপজেলা থেকে ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যর বিভিন্ন দেশে আম রফতানি করা হয়। বাঘার আম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সাদিয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক শফিকুল ইসলাম ছানা প্রতিবার ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আম রফতানি করে থাকেন। এবারও তিনি করেছেন তা পরিমাণে খুবই কম।
রফতানি কমের কারণ হিসেবে ছানা বলেন, দেশে এবার আমের দাম বেশি গেছে। পাশের দেশ ভারতে অনেক কম দামে আম রফতানি করেছে। তাদের দেশে আমের দামও খুব কম ছিল। এছাড়া বিমান ভাড়াও বেড়েছে। এর কারণে আমরা প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে গেছি।
আরেকটি কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এবার রাজশাহীতে অতিরিক্ত গরম ছিল। কাঙ্খিত যে বৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল তাও হয়নি। প্রতিটি আম সাইজে ছোট ছিল। কোয়ালিটি পরীক্ষায় সেগুলো পাঠানো সম্ভব ছিল না। গোপালভোগ, হিমসাগর ও ল্যাংড়া আমরা আকারে অনেক হয়েছিল। এ কারণে রফতানি করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
বাঘা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিউল্লাহ সুলতান জনি বলেন, যেসব আম রফতানি করা হয় তার জন্য আলাদা পরিচর্যা করা হয়। কিন্তু এইবার অতিরিক্ত তাপমাত্রা থাকার কারণে আমে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কাঙ্খিত যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল তা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। প্রতিটি আম সাইজে ছোট, দাগ ও সুস্বাদু হয়নি। তাই এবছর সেভাবে বিদেশে আমও পাঠাননি আমচাষি ও রফতানিকারকরা।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোজদার হোসেন বলেন, রাজশাহী জেলার মধ্যে আমের উৎপাদন সবচেয়ে বেশি বাঘায়। এই এলাকা থেকে বিদেশে আম রফতানিও হয় বেশি। এবার আমের ফলন ভালো হয়েছে। বিদেশে বাংলাদেশের আমের চাহিদা ও বাজারও বেশ বড় ছিল। আম রফতানি করতে না পারার ব্যর্থতাও ব্যবসায়ী ও আমচাষিদের। ভালো আম যদি না পাঠায় বাইরের দেশগুলোতে আর নেবে না।
তিনি আরও বলেন, রাজশাহী অঞ্চলের কৃষক ও ব্যবসায়ীদের প্রতিনিয়ত আমের রক্ষণাবেক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের বিষয়ে পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ব্যাগিং পদ্ধতিসহ পোকামুক্তভাবে উন্নতজাতের আম উৎপাদন করে কৃষক ও আম ব্যবসায়ীরা লাভবান হওয়ার কথা। কিন্তু তারা ব্যর্থই হয়েছেন। পর্যাপ্ত পরিমাণে কেমিক্যাল না দেওয়া, ঠিকভাবে ফ্রুট ব্যাগিং না করা এর অন্যতম কারণ। আগামী বছরে তাদের নিয়ে ভালোভাবে পরামর্শ নিয়ে আম রফতানিতে উদ্ধুত করা হবে।

সব খবর